,

মানব সেবায় ইসলাম -দৈনিক জনসংযোগ

janasongjog

মানব সেবায় ইসলাম
_____________উবাইদুল্লাহ ইবনে আহমাদ।

كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
[ তোমরা উত্তম জাতি, মানুষের কল্যাণের জন্য তোমাদের আবির্ভাব। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে আর
মন্দ কাজে বাঁধা দিবে। আল ইমরান-১১০]
বিশ্ব জাহানের অধিপতি আল্লাহকে কাছে পাওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম হলো মানবসেবা। ইসলাম মানুষের সঙ্গে
মানুষের ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্যে অনুপ্রেরণা দেয়। মানুষের সেবা করতে এবং তার
কষ্ট, অসুবিধা দূর করার জন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম নিজেও নির্দেশ দিয়েছেন।
মানবসেবা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। একজন মুসলমান হিসেবে প্রত্যেকেরই কর্তব্য মানুষের দুঃখে
কষ্টে পাশে থাকা, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। আল্লাহর প্রেরিত নবী রাসূল এবং পীর-আউলিয়ারা যারা ইসলাম
প্রচারের জন্য এ দেশে এসেছিলেন, তারা সবাই মানবতার সেবায় এক নিবেদিত প্রাণ ছিলেন।
মানব জীবনের বহুমুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে মানবতার কল্যাণ প্রতিষ্ঠাই হলো মানব সেবা। মানব সেবা 'হাক্কুল
ইবাদ' এর একটি অংশ। চরম বিশ্বস্ততার সাথে 'হাক্কুল ইবাদ' পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু নিজের কিংবা
নিজের পরিবার-পরিজনের আরাম আয়েশ করার অধিকার মুসলমানদের দেওয়া হয়নি। বরং তার আনন্দ-বেদনা
সুখানুভূতি ও সম্পদে রয়েছে তার প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, ও গরীব-দুঃখী মানুষের অংশ ও অধিকার।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, "তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। (সূরা রূম -২১)
রাসুল (স.) বলেছেন, " তোমরা ঈমান না আনা পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আবার পরস্পরকে
ভালবাসতে না পারা পর্যন্ত ঈমানদার হয়ে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয়ের খবর বলে দিব? যা
করলে তোমরা পরস্পরকে ভালবাসতে সক্ষম হবে। তা হলো- তোমাদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করবে।
মানব চরিত্রেকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যার একটি হলো আখলাকে হামিদা বা প্রশংসীয় চরিত্র আর অপরটি
হলো আখলাকে যামিমা বা নিন্দনীয় চরিত্র। মানব সেবা আখলাকে হামিদার অন্তর্ভুক্ত। মুলত, মানব সেবাই
মানুষের উন্নত চরিত্রের পরিচায়ক। মহৎ প্রাণের সাথেই মানবসেবা জড়িত। অর্থ্যাৎ যিনিই মানবসেবা করবেন
তিনিই হবেন মহৎ প্রাণের অধিকারী।
মহানবী (স) বলেছেন, "যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন না।" (সহীহ বোখারী)
প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আমরা সকলেই আল্লাহর সাহায্য প্রার্থী। কেউ তার দৃশ্যমান ভালো কাজের জন্য
সরাসরি আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে অপরদিকে কেউ তার দৃশ্যমান মন্দ কাজের কারণে সরাসরি আল্লাহর
সাহায্য প্রার্থনা করতে পারেনা। তা সত্বেও সে গোপনে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে। বস্তুত মন্দ কাজের
করুণ পরিণতি জেনেও আমরা কিন্তু ভালোর তুলনায় খারাপ কাজের দিকে ধাবিত হচ্ছি প্রতিনিয়ত অনেক বেশিই।
দিনের পর দিন খারাপ কাজ করেও আমরা গোপনে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকি। মূলতঃ কেউই
আমরা করুণ পরিণতির শিকার হতে চাই না।

সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহ তায়ালার সাহায্য প্রাপ্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হলো মানবসেবা।
রাসুল (স) বলেছেন, "বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যরত থাকে ততক্ষণ আল্লাহ তাকে সাহায্য করতে
থাকেন।" (সহীহ মুসলিম)।

সকলেই আমরা আদম সন্তান। সুতরাং সকলে আমরা ভাই ভাই। আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে মানবসেবায়
নিজেদেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়োজিত রাখতে হবে। মানবসেবা বিভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে। যেমনঃ ক্ষুধার্ত
কে খাদ্য দান, বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দান, রোগীর সেবা করা, ছোটদের স্নেহ করা,
বয়স্কদের শ্রদ্ধা করা, বৃক্ষ রোপন এসবই মানবসেবার অন্তর্ভুক্ত।

মানবসেবার প্রতিদান সীমাহীন। শেষ বিচারের দিন, যেদিন কেউই কাউকে সাহায্য তো দুরের কথা পরিচয় পর্যন্ত
দিবে না সেদিন আল্লাহ তায়ালা মানব সেবাকারীদের মহা পুরষ্কার ও নিয়ামত দান করবেন। রাসুল (স) বলেন,
"কোন মুসলমান অন্য কোন মুসলমানকে কাপড় দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের পোষাক দান করবেন,
ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করলে তাকে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে সুস্বাদু ফল দান করবেন, কোন তৃষ্ণার্ত
মুসলমানকে পানি পান করালে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সিলমোহরকৃত পাত্র থেকে পবিত্র পানীয় পান
করাবেন।" (আবু দাউদ)।

নবীকূলের শিরোমণি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানব সেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন
করেছেন। ধনী-গরীব, ইয়াতিম-মিসকীন, ছোট-বড়, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে সাহায্য-সহযোগীতা
করতেন, খোঁজ খবর নিতেন। নবীজির চলার পথে কাঁটা বিছানো বুড়ির সাথে রাসুলের (স) ব্যবহার সত্যিই মহ
প্রাণের দাবি রাখে। সমাজে শান্তি- শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য "হিলফুল ফুযুল" গঠন মানব সেবায় অনুপ্রাণিত করে
যাচ্ছে আজও। মহানবী (স.) ছিলেন আদর্শের মূর্ত প্রতীক।
মানুষ হলো আশরাফুল। আসমান জমিনের মধ্যে যা কিছু আছে সবই মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
সুতরাং মানুষের কর্তব্য হলো এ সকল সৃষ্টির প্রতি সদয় হওয়া ও তাদের সাথে যথাযথ ব্যবহার করা। পাশাপাশি
সকল মানুষের প্রতি সাহায্য – সহযোগিতা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা মানুষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
পরস্পরের প্রতি সেবা সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আল্লাহর সকল সৃষ্টির প্রতি সদয় ও শ্রদ্ধাশীল হওয়ার তাওফিক দান
করুন। আমীন।